News

জাতীয় নির্বাচনেও খুলনা মডেল বাস্তবায়ন করা হতে পারে

খুলনা মডেলে গাজীপুরেও ‘নিয়ন্ত্রিত নির্বাচন’ অনুষ্ঠিত হয়েছে বলে মন্তব্য করেছে সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন)। আগামীতে সিলেট, বরিশাল, রাজশাহী সিটি এবং জাতীয় নির্বাচনেও একই মডেল বাস্তবায়ন করা হতে পারে বলে সংগঠনটি আশংকা প্রকাশ করেছে। বিভিন্ন গণমাধ্যম ও  নিজস্ব স্বেচ্ছাব্রতীদের মতামতের ভিত্তিতে সুজন জানিয়েছে, খুলনার মতো গাজীপুরেও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সহায়তায় প্রধান প্রতিপক্ষকে মাঠছাড়া করা হয়েছে। বিএনপি প্রার্থীর পোলিং এজেন্টদের দায়িত্ব পালনে বাধা দেয়া হয়েছে। নির্বাচনের দিন সাময়িকভাবে কেন্দ্র দখল করে জালভোট প্রদান, ভোটকেন্দ্রে এবং এর আশেপাশে ভীতিকর ও বিশৃঙ্খল পরিস্থিতির সৃষ্টি এবং ভোট প্রদানে বাধা দানের ঘটনা ঘটেছে।

খুলনার মতো গাজীপুরের নির্বাচনেও বহু অনিয়ম ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর হয়রানি ও বাড়াবাড়ির অভিযোগ উত্থাপন করা হয়েছে, যা সম্পর্কে নির্বাচন কমিশন ছিল নির্বিকার।গতকাল বৃহস্পতিবার ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটিতে ‘গাজীপুর সিটি করপোরেশন নির্বাচনে কেমন জনপ্রতিনিধি পেলাম’ শীর্ষক সংবাদ সম্মেলনে সুজন ভোটের এ চিত্র তুলে ধরে। ‘খুলনা মডেলের’ নির্বাচন আগামীতে তিন সিটিতে, এমনকি জাতীয় নির্বাচনেও বাস্তবায়ন হতে পারে বলে সংবাদ সম্মেলনে আশংকা প্রকাশ করেন তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক উপদেষ্টা ও সুজনের সভাপতি এম হাফিজ উদ্দিন খান। তিনি বলেন, খুলনায় এক প্রকার নিয়ন্ত্রিত নির্বাচন হয়েছে। আগে নির্বাচনে প্রার্থীদের সমর্থকদের মধ্যে মারামারি, কাটাকাটি হতো। খুলনায় সেটা হয়নি। কিন্তু সেখানে একটা ভীতিকর পরিস্থিতি সৃষ্টি করা হয়েছে যে বিএনপির প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার মতো অবস্থা ছিল না।

খুলনাতে সেরকম নির্বাচনের পরীক্ষা চলেছে এবং গাজীপুরে সেটা ব্যবহার করেছে। এখন ভয় হচ্ছে বাকি তিন সিটি নির্বাচন এবং জাতীয় নির্বাচনেও তা করতে পারে। এজন্য আমরা চাই নির্বাচন কমিশন সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের জন্য সাংবিধানিক দায়িত্ব অনুযায়ী যা যা করার করবে। তাদের যে ক্ষমতা দেয়া আছে তা ভারতের নির্বাচন কমিশনেরও নেই। সুজনের সাধারণ সম্পাদক ড. বদিউল আলম মজুমদার বলেন, গাজীপুর সিটি নির্বাচনে অধিক শিক্ষিতদের বেশি পরিমাণে নির্বাচিত হওয়া ইতিবাচক বিষয়। কিন্তু নেতিবাচক দিক হলো বরাবরের মতো এ নির্বাচনেও অধিক পরিমাণে ব্যবসায়ীরাই নির্বাচিত হয়েছে। এছাড়া অধিক সম্পদশালী ও যারা বেশি আয়কর দেন তারা বেশি পরিমাণে নির্বাচিত হয়েছেন। তিনি বলেন, জবরদস্তি করে সিল মারার কারচুপির নির্বাচনের একটি অন্যতম বৈশিষ্ট্য হলো ভোট প্রদানের হার বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বিজয়ীর ভোট প্রাপ্তির পরিমাণ আরো বেশি হারে বাড়বে এবং তাঁর অন্যতম প্রতিদ্বন্দ্বীর পরিমাণ আরো বেশি হারে কমবে।

একইভাবে ভোট প্রদানের হার বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বাতিল ভোটের হারও পরিবর্তিত হবে। আমাদের প্রাথমিক বিশ্লেষণ থেকে দেখা যায়, খুলনার মতো গাজীপুরেও তা ঘটেছে এবং কেন্দ্রভিত্তিক ফলাফল বিশ্লেষণ করে তাই দেখা গেছে। সুজন সম্পাদক আরো বলেন, যে রকম নির্বাচন করতে নির্বাচন কমিশন দায়বদ্ধ আমরা আশা করি সেরকম নির্বাচন গাজীপুরেও হয়নি, খুলনাতেও হয়নি। আমরা এ থেকে উত্তরণ চাই। সেজন্য আমরা সুস্পষ্ট কিছু সুপারিশ করেছি। বলটা এখন নির্বাচন কমিশনের কোর্টে। নির্বাচন কমিশন যদি বলটা সঠিকভাবে খেলে তাহলে আমরা সুষ্ঠু, গ্রহণযোগ্য নির্বাচন আশা করতে পারি। সুজনের কেন্দ্রীয় নির্বাহী সদস্য ড. হামিদা হোসেন বলেন, নির্বাচন পেশিশক্তি নির্ভর হওয়ায় এবং নারীদের সম্পদ ও আয় কম হওয়ায় নারীরা নির্বাচনে প্রার্থী ও নির্বাচিত হতে পারছেন না। আমরা আশা করি, এক্ষেত্রে রাজনৈতিক দলগুলো দায়িত্বশীলতার পরিচয় দেবে।

সংবাদ সম্মেলনে নির্বাচনে গাজীপুর সিটিতে বিজয়ী প্রার্থীদের তথ্যের বিশ্লেষণ উপস্থাপন করেন সুজনের কেন্দ্রীয় সমন্বয়কারী দিলীপ কুমার। সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়, গাজীপুর সিটি নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতার তুলনায় উচ্চ শিক্ষিতদের নির্বাচিত হওয়ার হার কিছুটা বেশি, যা ইতিবাচক। তবে অন্যান্য নির্বাচনের মতো গাজীপুর সিটি করপোরেশন নির্বাচনেও বিজয়ী জনপ্রতিনিধিদের মধ্যে ব্যবসায়ীদের প্রাধান্য লক্ষ্য করা যাচ্ছে। নব-নির্বাচিত ৭১ জন জনপ্রতিনিধিদের মধ্যে ৪৭ জনই ব্যবসায়ী। সুজনের বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, প্রতিদ্বন্দ্বিতার তুলনায় মামলা সংশ্লিষ্টদের নির্বাচিত হওয়ার হার বেশি।

স্বল্প আয়কারী প্রার্থীদের নির্বাচিত হওয়ার হার প্রতিদ্বন্দ্বিতার তুলনায় কম। এ ছাড়া ঋণগ্রহীতা ও কর প্রদানকারীদের নির্বাচিত হওয়ার হার প্রতিদ্বন্দ্বিতার তুলনায় বেশি। পরবর্তী নির্বাচনগুলো অবাধ, সুষ্ঠু করার লক্ষ্যে সংবাদ সম্মেলনে কিছু সুপারিশ রাখে সুজন। সুপারিশের মধ্যে রয়েছে, গাজীপুর নির্বাচনে যে সকল অনিয়ম ও ত্রুটি-বিচ্যুতি চিহ্নিত হয়েছে নির্বাচন কমিশন কর্তৃক তা আমলে নেয়া, এ ব্যাপারে পুঙ্খানুপুঙ্খ তদন্ত করা; প্রতিটি ঘটনার জন্য দায়ীদের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির ব্যবস্থা করা এবং সীমাবদ্ধতাগুলো কাটিয়ে ওঠার জন্য এখন থেকেই পূর্ব-প্রস্তুতিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করা; নির্বাচন কমিশনের/রিটার্নিং কর্মকর্তার পক্ষ থেকে প্রার্থীদের, বিশেষত মেয়র পদপ্রার্থীদের হলফনামাগুলো প্রয়োজনে এনবিআর ও দুদকের সহায়তা নিয়ে চুলচেরাভাবে যাচাই-বাছাই করা; প্রার্থীদের পক্ষ থেকে প্রতিপক্ষের হলফনামা চ্যালেঞ্জ করার বিধান স্থানীয় সরকারের ক্ষেত্রে এবং সকল ভোটারের জন্য প্রযোজ্য করা; ‘সকল প্রার্থীর সমান সুযোগ নিশ্চিতকরণে’র অভিপ্রায়ে নির্বাচন কমিশনের ‘গাজীপুর সিটি করপোরেশনের কোনো বাসিন্দা বা ভোটারকে বিনা ওয়ারেন্টে গ্রেপ্তার না করার’ নির্দেশনা সম্বলিত নির্বাচন কমিশনের ২৪ জুন-এর প্রজ্ঞাপনের মতো একই নির্দেশনা সিলেট, রাজশাহী ও বরিশাল সিটি করপোরেশন নির্বাচনের জন্যও অনতিবিলম্বে জারি করা; ভোট গ্রহণের সময় সকাল ৯টা থেকে বিকাল ৫টা পর্যন্ত করা এবং ব্যালট বাক্স ও ব্যালট পেপার ভোটকেন্দ্রে আগের রাতের পরিবর্তে ভোটের দিন সকালে বিতরণ করা; ভোট গ্রহণের শুরুতে ব্যালট বাক্স সবাইকে প্রদর্শনের সময়ে বাক্স খালি বলে সকল প্রার্থীর এজেন্টের স্বাক্ষরসংবলিত- যদি না কোনো প্রার্থী তার এ অধিকার প্রয়োগ করতে না চায়- একটি প্রত্যয়নপত্র প্রকাশ করা; প্রতি ঘণ্টায় মোট ভোট প্রদানের সংখ্যা সকল প্রার্থীর এজেন্টের স্বাক্ষরসংবলিত একটি প্রত্যয়নপত্র প্রকাশ করা এবং ভোট গণনা শেষে ভোটের হিসাব সকল প্রার্থীর এজেন্টের স্বাক্ষরসংবলিত একটি প্রত্যয়নপত্র প্রকাশ করা।

Leave a Reply

*

*